সাম্প্রতিক
মাদক মামলায় সখিপুরে একজনের যাবজ্জীবন রাজবাড়ীতে ৫টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ ৫ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ঠাকুরগাঁওয়ে চালানবিহীন ট্রাকভর্তি ৩৮০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ ভোলা বোরহানউদ্দিনে ‘কৃষক কার্ড’ বাস্তবায়নে কৃষকের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন ভৈরবে বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামবাসীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ: নিহত ২, আহত ২০, কয়েকটি বাড়িতে আগুন চার বছরে বেকারি পণ্য সরবরাহকারী থেকে ৩২ দোকান ও প্লটের মালিক, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন বেপরোয়া ট্রলির ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সাথে মেরে দিলো রাজবাড়ী সদরে র‍্যাবের অভিযানে ৫ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, গ্রেফতার ৫ আনন্দের মুহূর্তেই দীঘির পানিতে নিভে গেল সিমরানের প্রাণ সংশ্লিষ্ট ওই পুলিশ কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিহার পুলিশ

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে চায়না দুয়ারির থাবা, বিপন্ন পদ্মার জীববৈচিত্র্য

একসময় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের পদ্মা নদীর ইলিশের জন্য বিখ্যাত ছিল। এছাড়া জাল ফেললেই ধরা পড়তো, রুই, কাতলা, পাবদা, টেংড়া, চ্যাপলা, কৈসহ অসংখ্য রকমের দেশীয় মাছ। এখন সেই দৃশ্য প্রায় অতীত। নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ বা রিং জালের নির্বিচার ব্যবহারে দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছের ভান্ডার। হুমকির মুখে পড়ছে নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্র।
সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও উপজেলার এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে এই জাল। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল জব্দ করলেও জনবল ও লজিস্টিক সংকটের কারণে অবৈধ ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
১৯৫০ সালের মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী চায়না দুয়ারি জাল দেশে নিষিদ্ধ। তবু চলতি মৌসুমসহ প্রায় প্রতিবছর নদী, হাওর, খাল ও বিভিন্ন জলাশয়ে এই জালের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে, মরা পদ্মা সহ উপজেলার বিভিন্ন জলাশয়ের অগভীর অংশে অর্ধেক পানিতে ডুবিয়ে ও অর্ধেক পাড়ে রেখে এই জাল পেতে মাছ ধরা হচ্ছে। সূক্ষ্ম ও ঘন বুনোনের এ জাল শুধু বড় বা ছোট  মাছই নয়, ব্যাঙ, সাপ, শামুক, কাঁকড়া বিভিন্ন জলজ পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীকেও আটকে ফেলে। ফলে মাছের পাশাপাশি পুরো জলজ পরিবেশই মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
কম পরিশ্রমে বেশি মাছ, তাই বাড়ছে ব্যবহার:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন, ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও অনেকেই এ জাল ব্যবহার করেন। কারণ, এতে কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরা যায় এবং প্রয়োজন হলে সহজেই গভীর পানিতে লুকিয়ে রাখা সম্ভব। এ কারণেই অনেক জেলে নিষিদ্ধ জালের প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন।
দৌলতদিয়া বাজার মাছ ব্যবসায়ী শাজাহান শেখ বলেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি দেশের মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এ নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করছে। এতে শুধু মাছ নয়, প্রায় সব ধরনের জলজ প্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির সরদার বলেন, এ জালে পূর্ণবয়স্ক মাছের পাশাপাশি পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ এমনকি মাছের ডিমও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং নদীর জীববৈচিত্র্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।
উপজেলার সব এলাকায় একই চিত্র;
উপজেলার চারটি ইউনিয়নেই প্রায় সব এলাকায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বেড়েছে। উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সি বাজার এলাকায় পদ্মার শাখা নদীতে ছোট বড় অনেক চায়না দুয়ারি ও চায়না জাল দেখতে পাওয়া যায়। নদীতে কোস্ট গার্ডের টহল ও নিয়মিত অভিযানের মধ্যে ও নিয়মিত জাল পাতা হয়।
জানা যায়, স্থানীয় মমিন নামে একজন এগুলো পরিচালনা করে এবং নিয়মিত মাসোহারা দেয় কয়েক জনকে।
এক জেলে বলেন, চায়না দুয়ারি জাল সাধারণত এক থেকে দেড় ফুট উঁচু এবং ৬০ থেকে ৯০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। লোহার রিংয়ের কাঠামোর চারপাশে অত্যন্ত সূক্ষ্ম জাল লাগানো থাকে এবং এতে একাধিক প্রবেশপথ থাকায় মাছ সহজেই ঢুকে পড়ে, কিন্তু বের হতে পারে না। জালের ফাঁক এতই ছোট যে পোনাও রক্ষা পায় না। আকার ও মানভেদে একটি জালের দাম দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। তুলনামূলক কম দাম ও সহজলভ্য হওয়ায় এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
‘আগের সেই পদ্মা আর নেই’:
পদ্মা অকৃপণ হাতে তার বুকে ধারণ করতো বিভিন্ন ধরনের দেশীয় মাছ। জেলেরা সারারাত নদীতে মাছ ধরতো সেই মাছ সকালে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। পদ্মায় এখন আর আগের মতো মাছ নেই। এখন সারারাত নৌকা নদীতে থাকলে অনেক সময় খরচ উঠে আস না। অনেকেই এই পেশায় আর নেই। ভাগ্য বদলের আশায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।
৫৫ বছর বয়সী জেলে বাবুল দাস বলেন, ‘একসময় বর্ষায় একবার জাল ফেললেই শোল, গজার, পাবদা, কৈ সব ধরনের মাছ পাওয়া যেত। এখন এই জালের কারণে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। পোনা কিংবা ডিমও রক্ষা পায় না। আমাদের জীবিকাও হুমকির মুখে।’
‘জনবল সংকটে মৎস্য বিভাগ’:
উপজেলা মৎস্য বিভাগের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম পাইলট বলেন, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে উদ্ধারকৃত জাল ও দুয়ারী জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে।
তবে জনবল ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। যদিও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযানে কোস্ট গার্ড এবং নৌপুলিশ নিয়মিত সহযোগিতা করছে। এসব অভিযানে আমাদের কোন লোকবল নেই, ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে বলে অভিযানে যেতে হয় এমনকি আমাদের বিভাগের নিজস্ব কোন নৌকা বা স্পিডবোট নেই। এগুলো থাকলে আরও বেশি অভিযান পরিচালনা করা যেত। অভিযানের পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের আহ্বান ; উপজেলার মৎস্য সমিতি এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করে, চায়না দুয়ারি, কারেন্ট জালসহ সব ধরনের নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে মৎস্য অভয়াশ্রম সম্প্রসারণ, জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

Tags:

সম্পর্কিত খবর :