নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার ধনপুর গ্রামে সালিশের নামে মারধরের পর পায়ে শিকল ও গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় তালাবদ্ধ ঘর থেকে এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার (১০ আগস্ট ২০২৬) এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—তা নিয়ে এলাকায় রহস্য ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত যুবকের নাম শুভ্র (২০)। তিনি ধনপুর গ্রামের শ্রমিক আব্দুল মোমেনের ছেলে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার দিন সকাল ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে একই গ্রামের দৌলতপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে রাস্তায় শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে শুভ্রের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওই ছাত্রীর বাবা আনিচ মিয়াকে বিদ্যালয়ে ডেকে এনে থানায় লিখিত অভিযোগ করার পরামর্শ দেন।
তবে স্থানীয় মিজান, হীরা, আফজাল, বাবনসহ কয়েকজন যুবক বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ওই ছাত্রী ও তার পরিবারকে নিয়ে বাড়িতে চলে যান বলে স্থানীয়রা জানান।
অভিযোগ রয়েছে, সালিশের নামে দুপুরের দিকে শুভ্রকে মিজান, হীরা, আফজাল, বাবন, আনিচ মিয়া ও তার ছেলে মারধর করেন। ছেলেকে মারধরের দৃশ্য দেখে শুভ্রের বাবা আব্দুল মোমেনও তাকে মারধর করেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সালিশ থেকে শুভ্র ও তার মাকে রাতের মধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে শুভ্রের মা ও বোন তাকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখেন।
শুভ্রের মা বিকেল ৬টার দিকে ঘরে গিয়ে তাকে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলতে দেখেন বলে জানা গেছে।
পরে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে শুভ্রকে পায়ে শিকল বাঁধা এবং গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় আড়ার সঙ্গে ঝুলতে দেখতে পান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। তাদের দাবি, শুভ্রের পা বিছানার ওপর ছড়ানো ছিল এবং শরীরের অবস্থান নিয়েও তাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এ কারণে ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনোভাবে মৃত্যু হয়েছে—তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
খবর পেয়ে রাত ৮টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
এদিকে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা দাবি করে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান খান খায়রুল বলেন, “এটি হত্যা হোক কিংবা আত্মহত্যা—ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। সঠিক বিচার হলে সালিশের নামে মব কালচার বন্ধ হবে।”
তবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো থানায় কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। কেন তারা মামলা করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চম্পক দাম বলেন, “নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার আলামত পাওয়া গেলে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।”
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও পুলিশি তদন্তের পরই শুভ্রের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।



