সম্প্রতি হবিগঞ্জ, সিলেট ও কুড়িগ্রামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এবার নিজেদের শরিকদের মধ্যেও শুরু হয়েছে বাগযুদ্ধ।
হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রকাশ্য বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। হামলার ঘটনায় জামায়াত শুরুতে প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিক্রিয়া জানায়নি এমন অভিযোগ তুলে এনসিপির সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করছেন।
পাল্টা জামায়াতের সমর্থকেরা দাবি করছেন, হামলাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে এনসিপি। তবে দু’দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমের বিতর্ককে রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই এবং জোটগত সম্পর্কেও কোনো সংকট তৈরি হয়নি।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে হামলার ঘটনা ঘটে। দলটির অভিযোগ, বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালান। হামলায় এনসিপির স্থানীয় কর্মী আলিফ চৌধুরী গুরুতর আহত হন। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়েছে।
এ ঘটনার পরপরই ইসলামী ছাত্রশিবির হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। পরে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ কয়েকটি দলও পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। তবে মূল শরিক জামায়াতে ইসলামী প্রায় ২৮ ঘণ্টা পর আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে হামলার নিন্দা জানায়। এই বিলম্ব নিয়েই মূলত সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন এনসিপির কর্মী-সমর্থকেরা।
একই সময়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। পরদিন সিলেট ও কুড়িগ্রামেও এনসিপির পদযাত্রা ও মিছিলে হামলার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পরে ১১ দলীয় জোটের বৈঠকে এসব হামলার নিন্দা জানানো হয় এবং এনসিপির প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হয়।
তবে মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি উত্তাপ ছড়ায়। এনসিপির সমর্থকদের একটি অংশ অভিযোগ করেন, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না বলেই জামায়াত হামলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়নি। তাদের ভাষ্য, প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির প্রতি জামায়াত তুলনামূলক নমনীয় আচরণ করছে এবং সরকারবিরোধী রাজনীতিতেও দু’দলের মধ্যে সমঝোতার ইঙ্গিত রয়েছে।এর জবাবে জামায়াতের সমর্থকেরা ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তাদের দাবি, বিএনপি ও এনসিপির দ্বন্দ্ব বাস্তবের চেয়ে অনেকটাই রাজনৈতিক কৌশল। জুলাই মাসজুড়ে এনসিপিকে আলোচনায় রাখার জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনার অবতারণা করা হচ্ছে, যাতে বিরোধী রাজনীতিতে জামায়াতের পরিবর্তে এনসিপি বেশি গুরুত্ব পায়।
এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া এক পোস্টে তিনি হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ঘটনাকে ‘সুপরিকল্পিত’ বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য ছিল, এসব ঘটনার উদ্দেশ্য হতে পারে জুলাই মাসে জামায়াতকে আলোচনার বাইরে রাখা এবং এনসিপির প্রতি জনসমর্থন সৃষ্টি করা। পোস্টটি প্রকাশের কিছু সময়ের মধ্যেই তিনি সেটি মুছে ফেলেন। তবে এর আগেই তা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং জামায়াতের সমর্থকদের একটি অংশ তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
জাহিদুল ইসলামের ওই মন্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানান এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, হামলার ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর পরিবর্তে ষড়যন্ত্রের ব্যাখ্যা খোঁজা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিও জুলাই মাসেই ঘটেছে। তার মতে, এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হলে কিছু রাজনৈতিক পক্ষের অস্বস্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।এরপর দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে। জামায়াতের সমর্থকেরা দাবি করেন, হামলার পর বিভিন্ন স্থানে এনসিপির নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরাই এগিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে হবিগঞ্জ ও সিলেটের জকিগঞ্জে এনসিপির নেতাকর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে জামায়াতের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে এনসিপির সমর্থকেরা বলেন, বাস্তব সহায়তার কথা তুলে ধরে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদে বিলম্বের বিষয়টি আড়াল করা যাচ্ছে না।
তবে সামাজিক মাধ্যমে উত্তপ্ত আলোচনা চললেও মাঠের রাজনীতিতে দু’দলের সম্পর্ক ভাঙনের কোনো প্রকাশ্য লক্ষণ দেখা যায়নি। রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন আহত এনসিপিকর্মী আলিফ চৌধুরীকে দেখতে যান জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিচারের দাবি করেন। একই সময়ে ১১ দলীয় জোটও আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।