নওগাঁর মান্দা উপজেলার বুড়িদহ বাজারে একসময় জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উপলক্ষে বসত শতবর্ষী ঐতিহ্যের বিশাল মেলা। মাটির পুতুল, খেলনা, মিষ্টির দোকান, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, কৃষিপণ্য, নাগরদোলা, সার্কাস, যাত্রাপালা, কবিগান, বাউল গান ও কীর্তনের মতো লোকজ আয়োজনকে ঘিরে মুখর থাকত পুরো এলাকা। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার মেলা। আর যে শতবর্ষী পিতলের রথকে ঘিরে এ আয়োজন, সেটিও এখন জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে।
আষাঢ মাসের শুক্লা পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রথটির আনুষ্ঠানিক টান দেওয়া হবে। তবে আগের মতো বুড়িদহ বাজারে নয়, এবারও আয়োজন হবে শামুকখোল গ্রামে। মেলার কোনো আয়োজন থাকছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শামুকখোল গ্রামের ব্যবসায়ী নিভর্ষী মোহন প্রামাণিক ব্যবসার কাজে নিয়মিত কলকাতায় যেতেন। সেখানে বউবাজার, পোস্তা ও জানবাজার এলাকায় পিতলের তৈরি রথ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি বৃহৎ রথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৩১৬ বঙ্গাব্দে (১৯০৯-১৯১০ খ্রিস্টাব্দ) কলকাতার দক্ষ সূত্রধর, ভাস্কর, লৌহকার ও রংমিস্ত্রিদের সমন্বয়ে নির্মিত হয় এই পিতলের রথ।
নিভর্ষী মোহন প্রামাণিকের উত্তরসূরি মোহিনী মোহন প্রামাণিক জানান, রথটি নির্মাণের পর নৌপথে বুড়িদহ বাজারে আনা হয়। সে সময় এত বড় রথ পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। এরপর থেকেই বুড়িদহ বাজারে রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় এবং ধীরে ধীরে এটি এলাকার অন্যতম প্রধান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়।
তিনি বলেন, রথযাত্রাকে ঘিরে প্রতিবছর ১০ দিনব্যাপী বসত বিশাল মেলা। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজনেরা বেড়াতে আসতেন। আশপাশের গ্রামগুলো পরিণত হতো মিলনমেলায়। দর্শনার্থীরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনন্দ ভাগাভাগি করে বাড়ি ফিরতেন।
মোহিনী মোহন প্রামাণিকের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বুড়িদহ বাজারে খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় রথটির বেশ কয়েকটি মূল্যবান মূর্তি চুরি হয়ে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে পরে রথটি তাঁদের বাড়ির খলিয়ানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও বয়সের ভারে রথটি এখন জরাজীর্ণ। তিনি বলেন, এই ঐতিহ্যবাহী রথ সংরক্ষণে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি রথযাত্রার মেলা পুনরায় চালু করা গেলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরে আসবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রামাণিক পরিবারের আরেক উত্তরসূরি দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক বলেন, বাংলার রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির ঐতিহাসিক মিলনমেলা। বুড়িদহ বাজারের রথযাত্রাও এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে সেই ঐতিহ্য বহন করে আসছে।
তিনি আরও বলেন, এই রথযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ। হিন্দু, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে রথ টানতেন, মেলায় অংশ নিতেন, ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। গ্রামীণ বাংলায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সামাজিক ঐক্যের এটি ছিল এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রথটি স্থানীয় ইতিহাস, পারিবারিক উত্তরাধিকার, লোকজ সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে টিকে আছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বুড়িদহ বাজারের শতবর্ষী রথযাত্রার ইতিহাস, নির্মাণশৈলী ও লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা, প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষণ এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। তাদের মতে, এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি রথকে রক্ষা করা নয়, বরং বাংলার লোকসংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা।











