সাপ বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণী দেখলেই ভয় পেয়ে অনেকেই সেগুলো মেরে ফেলেন। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব প্রাণীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব প্রাণীরই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে, এই বিশ্বাস থেকেই খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার হৃদয় বড়ুয়া নিজেকে উৎসর্গ করেছেন সাপ ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার এবং সংরক্ষণের কাজে।
২০২০ সাল থেকে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে একাই সাপ ও বন্যপ্রাণী উদ্ধারের কাজ শুরু করেন হৃদয় বড়ুয়া। পরে ২০২২ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের অধীনে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালাবিষয়ক ১০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তিনি আরও দক্ষতার সঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
এ পর্যন্ত তিনি তিন শতাধিক বিষধর ও নির্বিষ সাপ এবং ৬০টিরও বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছেন। উদ্ধার করা সাপের মধ্যে রয়েছে লালগলা ডোরা, ছোট কৃষ্ণ কালাচ, শঙ্খিনী, হেলে, ঘরগিন্নি, দুধরাজ, ইন্দোচীন দাঁড়াশ ও উদয়কালসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। এছাড়া লজ্জাবতী বানর, বন মোরগ, ময়না, টিয়াসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে নিরাপদে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করেছেন।
হৃদয় বড়ুয়া বলেন, “অনেকেই ভয় বা ভুল ধারণার কারণে সাপ দেখলেই মেরে ফেলেন। অথচ অধিকাংশ সাপই মানুষের কোনো ক্ষতি করে না; বরং কৃষি ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। আমি মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি নিরাপদে সাপ উদ্ধার করে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করার চেষ্টা করি।”
তিনি আরও বলেন, “২০২০ সাল থেকে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে এই কাজ করে আসছি। যে কোনো সময় খবর পেলেই ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপ বা বন্যপ্রাণী উদ্ধার করি। ভবিষ্যতেও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যেতে চাই।”
শিক্ষাজীবন শেষ করে বর্তমানে হৃদয় বড়ুয়া গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তবে সাপ ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার এখন তার নেশা এবং দায়িত্ববোধে পরিণত হয়েছে। তার উদ্যোগে স্থানীয় কয়েকজন তরুণকে নিয়ে গড়ে উঠেছে স্বেচ্ছাসেবী ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ন্যাচার কনসার্ভেশন অ্যালায়েন্স (এনসিএ)’। সংগঠনটির মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী রক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত কাজ করছেন তারা।
দীঘিনালা বন বিভাগের মেরুং রেঞ্জ কর্মকর্তা বাবুরাম চাকমা বলেন, “হৃদয় বড়ুয়ার মতো স্বেচ্ছাসেবীরা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সাপ বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলে হত্যা না করে বন বিভাগ বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকর্মীদের খবর দেওয়া উচিত। এতে যেমন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তেমনি জীববৈচিত্র্যও সংরক্ষিত থাকে।”
স্থানীয়দের মতে, হৃদয় বড়ুয়ার এই উদ্যোগ শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেই ভূমিকা রাখছে না, বরং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তার এ স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এলাকায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।











