জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নে সড়ক পাকাকরণের ভুয়া নাটকের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কের সরকারি ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়ার একটি নজিরবিহীন ও অভিনব জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে. ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের এই ভুয়া প্রকল্পের ফাঁদে ফেলে চোরচক্রটি প্রায় ২৬ লাখ টাকার ইট বিক্রি করে দিয়েছে. ঘটনার বিশদ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. মিষ্টিমুখ ও জাঁকজমকপূর্ণ ‘ভুয়া’ উদ্বোধন
গত ১২ মে রশিদপুর ইউনিয়নের পাকুল্যা ভাঙ্গুনী ঘাট থেকে গজারিআটা গ্রামের সাড়ে ৩ কিলোমিটারের পুরোনো ইটের রাস্তাটি কার্পেটিং (পাকা) করা হবে বলে প্রচারণা চালায় একটি প্রতারক চক্র. এই উপলক্ষে তারা একটি জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনের আয়োজন করে এবং উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা, দলীয় নেতাকর্মীদের খুরমা-জিলাপি খাইয়ে মিষ্টিমুখ করায়. অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন. তিনি সরল বিশ্বাসে ফিতা কেটে এই উন্নয়ন কাজের ‘উদ্বোধন’ করেন.
২. যেভাবে চালানো হলো ইট চুরি
এমপি নিজে কাজের উদ্বোধন করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি. উদ্বোধনের পরের দিন থেকেই কথিত সাব-ঠিকাদার আবদুল মান্নান ও তার লোকজন রাস্তা পাকা করার নাম করে পুরোনো ইটের সলিং তুলতে শুরু করে. চক্রটি রাস্তা থেকে প্রায় ৬ লাখ সরকারি ইট তুলে নেয় এবং ট্রাকে করে অন্যত্র সরিয়ে ফেলে. এমনকি তারা স্থানীয় কিছু বাসিন্দার কাছে প্রতি হাজার ইট ৭ হাজার টাকা দরে সরাসরি বিক্রিও করে দেয়.
৩. যেভাবে ফাঁস হলো প্রতারণা
সড়কের সব ইট তুলে নিয়ে যাওয়ার পরও যখন কোনো নতুন কাজ শুরু হচ্ছিল না, তখন স্থানীয়দের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে. এরপর গত ১৬ জুন এই চক্রটি পাশের চাঁদপুর এলাকায় একইভাবে আরেকটি রাস্তার ইট চুরির চেষ্টা করার সময় ধরা পড়ে যায়. এলাকাবাসী তাদের আটকে রেখে কাজের বৈধ নথিপত্র দেখতে চায়. কোনো কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ক্ষুব্ধ জনতা চক্রের মূল হোতা আব্দুল মান্নানসহ ১১ জন সদস্যকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে.
৪. কোনো টেন্ডারই হয়নি: প্রশাসন ও এমপির বক্তব্য
- সংসদ সদস্য (এমপি): শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন জানান, এলাকাবাসী তাকে উন্নয়ন কাজের কথা বলায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন. পরে সন্দেহ হলে তিনি এলজিইডি ও প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারেন যে পুরো বিষয়টি ছিল একটি সাজানো প্রতারণা.
- এলজিইডি ও উপজেলা প্রশাসন: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার নিশ্চিত করেছেন যে ওই সড়কের জন্য কোনো প্রকার দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি.
৫. বর্তমান পরিস্থিতি ও চরম জনদুর্ভোগ
ইট চুরির ঘটনায় এলজিইডি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির পক্ষ থেকে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে. তবে পুরো সড়কটি থেকে ইট পুরোপুরি তুলে ফেলায় বর্ষার কাদাপানিতে রাস্তাটি এখন সম্পূর্ণ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে. যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং হাঁটার পথও কর্দমাক্ত হওয়ায় এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন












