নওগাঁর মহাদেবপুরে গৃহবধূ নাজমা খাতুন (২৪) মৃত্যুর ঘটনায় থানা পুলিশের ‘আত্মহত্যা’র দাবি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নিবিড় ও পেশাদার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনি। ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজালেও মূলত স্ত্রী নাজমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিলেন স্বামী ময়জুল ইসলাম (৩২)। ৩ দিনের রিমান্ডে সিআইডির আধুনিক জিজ্ঞাসাবাদে সত্য স্বীকারের পর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ঘাতক স্বামী। সিআইডি নওগাঁ ইউনিট সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২ অক্টোবর সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে মহাদেবপুর উপজেলার পাতনা গ্রামে স্বামী ময়জুল ইসলামের বাড়িতে মারা যান নাজমা খাতুন। ঘটনার পরপরই ধূর্ত স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন নাজমার পরিবারকে ফোন করে জানান, নাজমা ঘরের তিরের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
তবে বোনের এমন আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি নিহতের পরিবার। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অসংলগ্ন কথাবার্তায় সন্দেহ হলে নিহতের ভাই মো. শাহিন বাদী হয়ে মহাদেবপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(ক)/৩০ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মহাদেবপুর থানা পুলিশ মামলার প্রাথমিক তদন্ত শেষে ঘটনাটিকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা উল্লেখ করে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। কিন্তু থানা পুলিশের এই দায়সারা তদন্তে চরম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে নিহতের পরিবার। এটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে আদালতে ‘নারাজি’ আবেদন করেন মামলার বাদী মো. শাহিন। এর প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত থানা পুলিশের চার্জশিট আমলে না নিয়ে মামলাটি অধিকতর ও সুক্ষ্ম তদন্তের জন্য সিআইডি নওগাঁ ইউনিটকে নির্দেশ দেন।
আদালতের আদেশে তদন্তের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক (নি.) মো. মজিবর রহমান। প্রথাগত তদন্তের বাইরে গিয়ে তিনি ঘটনাস্থল, আসামির গতিবিধি এবং কথিত আত্মহত্যার পারিপার্শ্বিক আলামতগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। সুরতহাল ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে একের পর এক অসংগতি তদন্তকারী কর্মকর্তার নজরে আসে। ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড—এমন দৃঢ় সন্দেহ থেকে মূল অভিযুক্ত স্বামী ময়জুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ৩ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানালে বিজ্ঞ আদালত তা মঞ্জুর করেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, রিমান্ডে এনে সিআইডির চৌকস দল তাদের আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক কৌশল প্রয়োগ করে জেরা শুরু করে। প্রথম দিকে ময়জুল ঘটনাটি ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করলেও সিআইডির অকাট্য যুক্তি ও তথ্যের মুখে একপর্যায়ে ভেঙে পড়ে। সে স্বীকার করে যে, ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার গল্পটি সম্পূর্ণ সাজানো ছিল। পারিবারিক কলহের জেরে সে নিজেই তার স্ত্রী নাজমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
রিমান্ডে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দেওয়ার পর আসামি ময়জুল ইসলামকে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদান করে এবং কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে।
একটি ক্লুলেস ঘটনার আড়ালে থাকা প্রকৃত সত্য সিআইডির নিখুঁত তদন্তে বেরিয়ে আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসামির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তির পর এখন মামলাটি হত্যা মামলায় (৩০২ ধারা) রূপান্তরিত হবে, যার ফলে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার পথ সুগম হলো।












