খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ১ নম্বর মেরুং ইউনিয়নের মধ্য বোয়ালখালী বাইতুন নূর জামে মসজিদের এক কোণেই কেটে গেছে এক বৃদ্ধের জীবনের প্রায় ২৫ বছর। এলাকাবাসীর কাছে তিনি ‘কনু মিয়া’ নামে পরিচিত হলেও আজও কেউ জানে না তার প্রকৃত নাম, স্থায়ী ঠিকানা কিংবা পরিবারের কোনো সন্ধান।
পরিচয়হীন এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখে নীরবে পার করছেন জীবনের শেষ সময়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০১ সালের দিকে আশ্রয়হীন অবস্থায় মধ্য বোয়ালখালী বাজারে প্রথম দেখা যায় কনু মিয়াকে। প্রথমে অনেকেই তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে করলেও পরে কথাবার্তা ও আচরণে বুঝতে পারেন, তিনি স্বাভাবিক মানুষ। মানবিক বিবেচনায় স্থানীয়দের উদ্যোগে তাকে মধ্য বোয়ালখালী বাইতুন নূর জামে মসজিদে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই মসজিদটিই তার একমাত্র আশ্রয়স্থল।
বর্তমানে দিনের অধিকাংশ সময় তিনি মসজিদের পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যয় করেন। নিয়মিত মসজিদের আঙিনা ঝাড়ু দেন, অজুখানা পরিষ্কার করেন এবং মসজিদের অন্যান্য ছোটখাটো কাজ করে থাকেন।
বিকেলে বাজারের বিভিন্ন দোকানে গিয়ে মানুষের স্বেচ্ছায় দেওয়া সামান্য সহায়তা গ্রহণ করেন। সেই অর্থেই চলে তার ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। দুপুরের খাবার হিসেবে প্রায়ই স্থানীয় বিভিন্ন বাড়িতে ডাল-ভাত খেয়ে থাকেন। এলাকাবাসীর দাবি, তিনি মাছ বা মাংস খুব কমই খান।
স্থানীয়রা আরও জানান, কনু মিয়া অত্যন্ত নীরব স্বভাবের মানুষ। প্রয়োজন ছাড়া তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কেউ তার পরিচয় বা অতীত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দেন না। তার এই নীরবতাই আজও তার পরিচয়কে রহস্যাবৃত করে রেখেছে।
মধ্য বোয়ালখালী গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা শাজাহান বলেন, “প্রায় ২৫ বছর ধরে কনু মিয়া এই মসজিদে আছেন। তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সন্ধান আমরা কখনো পাইনি। প্রতিদিন তিনি মসজিদের মাঠ পরিষ্কার করেন, ঝাড়ু দেন। এভাবেই তার জীবন কাটছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ছগির হোসেন জানান, ২০০১ সালের দিকে প্রথম তিনি কনু মিয়াকে বাজারে দেখেন। তখন তিনি বাজারেই রাত কাটাতেন। পরে কথা বলে বুঝতে পারেন তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন নন। এরপর এলাকাবাসীর উদ্যোগে তাকে মসজিদে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
মধ্য বোয়ালখালী বাইতুন নূর জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সেলিম মিয়া বলেন, “কনু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মসজিদে আছেন। তার পরিচয় বা পরিবারের কোনো সন্ধান আমরা পাইনি। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে তার থাকার জন্য একটি ছোট ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে কিছু অর্থ সংগ্রহ করে তার ওষুধ ও প্রয়োজনীয় খরচের ব্যবস্থা করা হয়।”
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আজাদ হোসেন কালু বলেন, “কনু মিয়ার বয়স এখন প্রায় ৭০ বছর। জীবনের এই শেষ সময়ে তার পরিবারের সান্নিধ্যে থাকা উচিত। আমরা চাই তার প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত হোক, যাতে তিনি শেষ জীবনটা স্বজনদের ভালোবাসার মধ্যে কাটাতে পারেন। এ জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করছি।”
দীর্ঘ এক যুগ নয়, প্রায় আড়াই দশক ধরে একটি মসজিদকে নিজের ঠিকানা বানিয়ে বেঁচে আছেন কনু মিয়া। অথচ আজও অজানা রয়ে গেছে তার প্রকৃত পরিচয়। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা স্বজন যদি তাকে শনাক্ত করতে পারেন, তবে জীবনের শেষ সময়টুকু হয়তো আপনজনদের সান্নিধ্যেই কাটাতে পারবেন এই নীরব মানুষটি।