বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ অভিঘাতের মুখোমুখি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও লবণাক্ততার মতো সমস্যাগুলো ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে সহজ, কার্যকর ও স্বল্প ব্যয়বহুল উপায়গুলোর একটি হলো—বৃক্ষ সংরক্ষণ এবং নতুন করে গাছ লাগানো।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনও প্রতিদিন অসংখ্য গাছ কাটা হচ্ছে। অনেক সময় প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই রাস্তার পাশের গাছ, বসতভিটার গাছ কিংবা কৃষিজমির আশপাশের গাছ কেটে বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কমছে সবুজের পরিমাণ।
সম্প্রতি রাস্তার পাশে একটি ট্রাকটর মালবাহী গাড়িতে বিপুল পরিমাণ কাটা গাছ বহনের দৃশ্য স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ঘটনাটি দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—গাছগুলো কোথা থেকে কাটা হয়েছে? প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানে কি না? যদিও ছবির ভিত্তিতে গাছ কাটার বৈধতা বা অবৈধতা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়, তবে এমন দৃশ্য পরিবেশ সচেতন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। একই সঙ্গে গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে, বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এবং তাপমাত্রা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একটি গাছ কাটা মানে শুধু একটি কাঠের গুঁড়ি কমে যাওয়া নয়; বরং পরিবেশের জন্য একটি বড় ক্ষতি।
বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর বর্ষাকালে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। “গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান”—এই আহ্বান এখন জাতীয় আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করছে। বিভিন্ন এলাকায় লক্ষাধিক চারা বিতরণ ও রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বারবার সতর্ক করে বলছে, যদি এখনই বন উজাড় ও নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, পানির সংকট এবং অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের মতো সমস্যা আরও বাড়বে।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধু গাছ লাগালেই হবে না; লাগানো গাছ রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একদিকে লাখ লাখ চারা রোপণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিদিন যদি সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি গাছ কাটা হয়, তাহলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সুফল অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, গাছ কাটার ক্ষেত্রে আইন ও নিয়মকানুন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। কোথায়, কেন এবং কী অনুমতিতে গাছ কাটা হচ্ছে—সেটি নিয়মিত তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কাটা গাছের পরিবর্তে একাধিক নতুন গাছ লাগানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকেরও নৈতিক দায়িত্ব। বাড়ির আঙিনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তার পাশ, খালি জায়গা কিংবা পতিত জমিতে বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় গাছ কাটা থেকে বিরত থাকতে হবে।
রাস্তার পাশে গাছভর্তি একটি ট্রাকটর হয়তো একটি দিনের দৃশ্য। কিন্তু এই দৃশ্য আমাদের সামনে বড় একটি প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সবুজ ভবিষ্যতের পথে এগোচ্ছি, নাকি নিজেদের হাতেই সেই ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি?
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটকালে প্রতিটি গাছ একটি জীবন্ত সম্পদ। তাই উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রয়োজন ছাড়া গাছ না কাটা, আর কাটতেই হলে আইন মেনে এবং তার পরিবর্তে একাধিক গাছ রোপণ করা—এটাই হতে পারে সময়ের সবচেয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
এই ফিচারটি একটি আলোকচিত্রকে কেন্দ্র করে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতামূলক বিশ্লেষণ। ছবির ভিত্তিতে গাছ কাটার বৈধতা বা অবৈধতা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত দাবি করা হচ্ছে না ।











