ঘাট আছে, ফেরি আছে—নেই নিয়মিত চলাচল। ফলে একটি নদী পার হতে গিয়ে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পিরোজপুরের কাউখালীর দুই ইউনিয়ন ও নেছারাবাদ উপজেলার একাংশের দুই পাড়ের মানুষ। বিশেষ করে রাতে ফেরি না চলায় বাড়তি ভাড়া দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে পারাপার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। জরুরি রোগী পরিবহন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাউখালীর সোনাকুর ফেরিঘাটে নিয়মিত ফেরি সার্ভিস না থাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি চলাচল করলেও তা নিয়মিত সেবায় রূপ নেয়নি। ফলে ফেরি থাকা সত্ত্বেও নদী পারাপারে বিকল্প নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাঁদের। এতে সময় ও খরচ বাড়ছে, পাশাপাশি যানবাহন ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।
সোনাকুর ফেরিঘাটে নিয়মিত ফেরি চালুর বিষয়ে কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেহেনা আক্তার বলেন, “উক্ত ফেরি এ মুহূর্তে নিয়মিত পরিচালনার পরিকল্পনা নেই। তবে রাতে খেয়া পারাপারে অনিয়মের কোনো অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেল জানান, আপাতত ফেরিটি নিয়মিত চলাচলের সম্ভাবনা নেই। তবে জরুরি প্রয়োজনে চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। দুই পাড়ের মানুষের চাহিদা ও গুরুত্ব বিবেচনায় ভবিষ্যতে ফেরিটি নিয়মিত চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
রাতে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার, বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের তুলনায় রাতে নদী পারাপারে ভোগান্তি বেশি। ফেরি না পেয়ে অনেককে বিকল্প নৌযান ব্যবহার করতে হয়। এ সময় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পর্যাপ্ত আলোর অভাব পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
বিশেষ করে ইঞ্জিনচালিত ছোট যানবাহন নৌকায় তোলা ও নামানোর সময় একাধিক ব্যক্তিকে সহায়তা করতে হয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। রাতের অন্ধকারে ঝুঁকি আরও বাড়ে। জরুরি প্রয়োজনে নদী পার হতে না পারলে অনেককে বিকল্প পথে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়।
পণ্য পরিবহনেও বাড়ছে ভোগান্তি
ফেরি নিয়মিত না চলায় সমস্যায় পড়ছেন পণ্য পরিবেশক ও ব্যবসায়ীরা। নদীর দুই পাড়ের দোকানপাটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে গিয়ে তাঁদের বিকল্প নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন পারাপার করতে হচ্ছে।
খাদ্যপণ্য পরিবেশক সমিতির সভাপতি, সাবেক সাধারন সম্পাদক, উত্তর বাজার কমিটি কাউখালী মো. জাকির হোসেন শেখ বলেন, “বর্তমানে ফেরি চলাচল না থাকায় পরিবেশকদের নদী পার হয়ে পণ্য ডেলিভারি নিশ্চিত করতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। পরিবেশকেরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে কয়েকজন মিলে ইঞ্জিনচালিত গাড়ি নৌকায় তোলেন। ফেরার সময়ও রাতে নৌকায় গাড়ি তুলতে গিয়ে ভয়াবহ ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।”
তিনি বলেন, “নিয়মিত না হলেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েকটি ট্রিপ ফেরি চলাচল করলে জনগণের কিছুটা কষ্ট লাঘব হতো।”
জরুরি রোগী নিয়ে উদ্বেগ
সোনাকুর ফেরিঘাটে নিয়মিত ফেরি না থাকার কারণে জরুরি রোগী পরিবহন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। নদীর দুই পাড়ের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে, দুর্ঘটনায় আহত হলে কিংবা প্রসূতির জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো জরুরি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় ফেরি না পেলে বিকল্প নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সময়ক্ষেপণ ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ায়।
স্থানীয়দের দাবি, জরুরি রোগী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রসূতিদের দ্রুত পারাপারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ফেরি চালু করা গেলে চিকিৎসাসেবা গ্রহণসহ দৈনন্দিন যাতায়াত অনেক সহজ হবে।
সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকটি ট্রিপ চালুর দাবি
স্থানীয়দের মতে, সোনাকুর ফেরিঘাট শুধু নদী পারাপারের মাধ্যম নয়; মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত। কাউখালীর ১ নম্বর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের পাশাপাশি নেছারাবাদ উপজেলার নদীর পশ্চিম পাড়ের ছয় ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগ সহজ করতে ঘাটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এলাকাবাসীর দাবি, আপাতত সার্বক্ষণিক ফেরি চালু সম্ভব না হলেও সকাল, বিকেল ও সন্ধ্যায় নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কয়েকটি ট্রিপ চালু করা হোক। পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি চালানো হলে দুই পাড়ের মানুষের কাছে আগাম প্রচারের ব্যবস্থাও চান তাঁরা।
একই সঙ্গে ঘাটে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, যানবাহন নিরাপদে ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা এবং রাতে ভাড়া-সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ফেরি থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত সেবা না পাওয়ার এই পরিস্থিতির অবসান চান দুই পাড়ের মানুষ। তাঁদের প্রশ্ন, ঘাট ও ফেরি থাকার পরও কেন নদী পারাপারে এত দুর্ভোগ? স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জনদুর্ভোগ, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন এবং দুই পাড়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সোনাকুর ফেরিঘাটে নিয়মিত ফেরি চালুর বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।।



