প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা চার হাজারের বেশি। খাবার ও চিকিৎসার অভাবে এসব কুকুরের দুর্ভোগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কুকুরগুলোর নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের প্রথম স্থায়ী কুকুর আশ্রয়কেন্দ্র।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নির্মিত এ আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ কুকুরের চিকিৎসার পাশাপাশি চলছে বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রম। উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন জার্মানি ও পেরুর দুই তরুণী।
মানবিকতার টানে জার্মানি থেকে সেন্টমার্টিনে এসেছেন জলপিয়া। তার সঙ্গে কাজ করছেন পেরুর জেসিকা মারিয়া।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, দ্বীপে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা চার হাজারের বেশি। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক কুকুরের খাবার ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক কুকুর অপুষ্টি ও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে কিছু কুকুরও। সীমিত সামর্থ্যের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষেও এসব প্রাণীর দেখভাল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্রটিতে কুকুরের খাবার ও চিকিৎসার পাশাপাশি বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের আশা, পরিকল্পিতভাবে বন্ধ্যাকরণ করা হলে কুকুরের অনিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধি কমবে। এতে ভবিষ্যতে খাবার ও চিকিৎসার সংকটও নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
পেরুর জেসিকা মারিয়া বলেন, একটি স্ত্রী কুকুর বছরে একাধিকবার বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যায়। এ কারণে বন্ধ্যাকরণ জরুরি। অনেক কুকুরের শরীরে টিউমার ও চর্মরোগ দেখা যাচ্ছে। এসব রোগে প্রাণীগুলো কষ্ট পাচ্ছে। তাদের দুর্ভোগ কমাতে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
জার্মানির জলপিয়া বলেন, রাস্তা থেকে অসুস্থ কুকুর উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হচ্ছে। সেখানে তাদের সুস্থ করে তোলার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বন্ধ্যাকরণও করা হচ্ছে। কুকুরের সংখ্যা কমলে তাদের খাবার ও চিকিৎসার সংকটও কমবে।
তিনি আরও বলেন, আগে দ্বীপে কুকুরের সংখ্যা আরও বেশি ছিল বলে তিনি শুনেছেন। অতিরিক্ত সংখ্যার কারণে প্রাণীগুলোকে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এখন ধাপে ধাপে চিকিৎসা ও বন্ধ্যাকরণের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা চলছে। একসঙ্গে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও প্রতিটি কুকুরকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
আশ্রয়কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কিশোর কুমার দাশ। তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনে এসে কুকুরগুলোর অবহেলিত অবস্থা এবং কয়েকটি কুকুরকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা তাকে ব্যথিত করে। এরপরই দ্বীপের কুকুরগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি।
কিশোর কুমার দাশ বলেন, কুকুরদের নিয়ে অনেকে কথা বললেও তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায় না। শুধু সাময়িক খাবার বা চিকিৎসা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কুকুরগুলোর জন্য স্থায়ী ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, দ্বীপের প্রকৃতি, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। কুকুরগুলোর নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে তাদের দুর্ভোগ কমাতে কাজ করতে চান তারা।
আশ্রয়কেন্দ্রটিতে ২০টি সেল্টার রয়েছে। প্রতিটিতে ১২টি করে কুকুর রাখার ব্যবস্থা আছে। কুকুরগুলোর চিকিৎসা ও পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছেন দুই চিকিৎসক।
উদ্যোক্তাদের আশা, এ আশ্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে সেন্টমার্টিনের বেওয়ারিশ কুকুরগুলোর দুর্ভোগ কমবে। পাশাপাশি পরিকল্পিত চিকিৎসা ও বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দ্বীপে মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থানের একটি মানবিক দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।