গুম নাটকের হোতা বেল্লাল হোসেনের সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। নামসর্বস্ব ডেভেলপার কোম্পানির আড়ালে সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের (মানিলন্ডারিং) অভিযোগে সম্প্রতি এ নির্দেশ দেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির। একইসঙ্গে ক্রোককৃত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শককে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ জারি করেন। বেল্লাল হোসেন এসব অর্থ আত্মসাৎ করতে একাধিক পাওনাদারের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবের হত্যা মামলা দায়ের করে; যা চ্যানেল 24-এর ইনভেস্টিগেশন টিম ‘সার্চলাইট’র দীর্ঘ এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে।
মামলার এজাহার ও আদেশ সূত্রে জানা যায়, আসামি বেল্লাল হোসেন ও তার সহযোগী মোসা. রেশমা আক্তার রিতা পরস্পর যোগসাজশে ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তারা নিজেদের ডেভেলপার কোম্পানির নাম ব্যবহার করে একাধিক ভিকটিমের কাছে অন্যের জমি ও সরকারি খাস জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রয় করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে বিক্রয়কৃত জমি বুঝিয়ে না দিয়ে ভিকটিমদের সঙ্গে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করতে থাকেন।
তদন্তকারী সংস্থা আদালতকে জানায়, অভিযুক্তরা প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে মোট ৪ কোটি ৬২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই অপরাধলব্ধ অর্থ বিভিন্নভাবে রূপান্তর, স্থানান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে নিজেদের নামে-বেনামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। তদন্তকালে এসব সম্পত্তি অন্যত্র হস্তান্তর বা বিক্রি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সিআইডি ক্রোকের আবেদন জানায়। আদালত এই আবেদন মঞ্জুর করে আসামির নামে থাকা চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের মোট ৩০ দশমিক ১১ শতক জমি এবং ঢাকার মিরপুরের সেকশন-১০-এ অবস্থিত দুটি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দেন। নিযুক্ত রিসিভারকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এসব সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রতি ৬ মাস পর পর আদালতে আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল করতে বলা হয়েছে।
প্রতারণা ঢাকতে ‘গুমের নাটক’ ও মিথ্যা মামলা
অনুসন্ধানী অনুষ্ঠানের অনুসন্ধান বলছে, ‘লেক্সাস ডেভেলপার্স লিমিটেড’ নামের একটি কথিত কোম্পানির কর্ণধার হিসেবে কুয়াকাটায় জমি বিক্রির নামে অসংখ্য গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বেল্লাল হোসেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন এমপি-মন্ত্রীদের দিয়ে অফিস উদ্বোধন করিয়ে প্রভাব খাটাতেন তিনি। কিন্তু ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর রাতারাতি রং বদলে ‘বাংলাদেশ গুম পরিবারের প্রধান সমন্বয়ক’ বনে যান বেল্লাল।
নিজের জালিয়াতি আড়াল করতে এবং জমি দাবি করা ভুক্তভোগী গ্রাহকদের হয়রানি ও ব্লাকমেইল করতে তিনি একের পর এক মিথ্যা মামলা ও ‘গুম নাটক’ সাজান। তিনি দাবি করেন, ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর কল্যাণপুর থেকে তাকে ১০-১৫ জন লোক তুলে নিয়ে ৩২ দিন গুম করে রেখেছিল এবং ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি মুক্তি পান। এই অজুহাতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও গুম কমিশনসহ বিভিন্ন জায়গায় একাধিক মামলা করেন, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে দেন। তবে অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে, প্রকৃত অর্থে গুম না হয়েও নিজেকে ‘গুমের শিকার’ দাবি করে মূলত প্রতারণার শিকার সাধারণ মানুষদের ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই তিনি এই ভয়ানক মিথ্যা মামলার জাল বিছিয়েছিলেন।
ভুক্তভোগীদের স্বস্তি ও ডা. শহীদুল বারীর বক্তব্য
এদিকে আদালতের এমন আদেশে দীর্ঘদিনের প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে। বেল্লাল হোসেনের জালিয়াতির অন্যতম শিকার, দেশের খ্যাতনামা বার্ন, প্লাস্টিক ও কসমেটিক সার্জন ডা. শহীদুল বারী আদালতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বেল্লাল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ডেভেলপার ব্যবসার নামে আমাদের মতো সাধারণ ও পেশাজীবী মানুষদের উপার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল। উল্টো যখন আমরা আমাদের ন্যায্য পাওনা বা জমি দাবি করেছি, তখন আমাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে এবং নিজেকে বাঁচাতে সে সাজানো ‘গুম নাটক’ ও মিথ্যা মামলার ফাঁদ পেতেছে। আদালতের এই সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ আমাদের প্রতি হওয়া দীর্ঘদিনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের প্রাথমিক জয়। আমরা আশা করি, পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে তার সমস্ত জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের পূর্ণাঙ্গ সত্য উন্মোচিত হবে এবং এই শীর্ষ প্রতারক তার উপযুক্ত শাস্তি পাবে।











