সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটায় তাছফিয়া খাতুন (১৯) নামে এক গৃহবধূকে যৌতুকের দাবিতে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে লাশ বারান্দায় রেখে ঘরে তালা ঝুলিয়ে নিহতের পরিবারকে আত্মহত্যার কথা বলে প্রচার করা হয়। এমনকি একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় পুলিশকে ম্যানেজ করে ঘটনাটি ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন নিহতের পরিবার।
গতকাল ৬ জুন শুক্রবার দুপুরে পাটকেলঘাটা থানার বাইগুনি গ্রামে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। নিহত তাছফিয়া একই গ্রামের আল-আমিন দালালের স্ত্রী এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পরানদাহ এলাকার সিদ্দিক আলী সরদারের মেয়ে। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী আল-আমিন পলাতক রয়েছে।
নিহতের পিতা সিদ্দিক আলী সরদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, মাত্র এক বছর আগে পারিবারিকভাবে আল-আমিনের সাথে তাছফিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই টাকার দাবিতে জামাতা, শাশুড়ি ও দেবর মিলে তার মেয়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। এর আগে ট্রলি কেনার কথা বলে জামাতা ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। সম্প্রতি নতুন আরেকটি ট্রলি কেনার অজুহাতে আবারও ১ লাখ টাকা দাবি করা হয়। গত পরশু সেই টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দরিদ্র বাবার পক্ষে তা জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় দুপুরে তাছফিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে খবর পেয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তিনি তাছফিয়ার মরদেহ দেখতে পান।
তাছফিয়ার ফুফু রোকসানা পারভীন জানান, মৃত্যুর খবর শুনে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ বারান্দায় শোয়ানো অবস্থায় দেখতে পান। সে সময় ঘরের দরজায় তালা ঝুলছিল। অভিযুক্ত আল-আমিন একেক সময় একেক কথা বলছিল—কখনও বলছিল তাছফিয়া রশি দিয়ে, আবার কখনও ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সন্দেহ হলে নিহতের গায়ের কাপড় সরিয়ে দেখা যায়, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, অথচ গলায় আত্মহত্যার কোনো দাগ বা চিহ্ন নেই। এতে স্পষ্ট হয় যে, তাছফিয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিয়ের পর থেকে দফায় দফায় নির্যাতনের কারণে এলাকায় একাধিকবার সালিশ-দরবারও হয়েছে। শুক্রবার সকালে পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে শাশুড়ি ও দেবর রুহুল আল-আমিন মিলে তাছফিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে।
নিহতের চাচী হাজিরা খাতুন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বিচারের দাবিতে পাটকেলঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুলের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি ঘটনার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত না করেই এটিকে আত্মহত্যা বলে রায় দেন। পরে মেয়ের নিরক্ষর বাবা সিদ্দিক আলীর কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে টিপসই নিয়ে তড়িঘড়ি করে অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা নথিভুক্ত করেন।” একটি প্রভাবশালী মহল ঘাতক পক্ষকে বাঁচাতে পুলিশকে ম্যানেজ করে মামলাটি ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে নিহতের বাবার সরাসরি অভিযোগ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাটকেলঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট (পোস্টমর্টেম রিপোর্ট) হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।











