সাম্প্রতিক
ওমান উপকূলে ট্যাঙ্কারে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা লালনের মাজারে অনৈতিক চর্চার অভিযোগ আমির হামজার, চান বন্ধের উদ্যোগ ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনী- রোটারির উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত চক্ষু রোগীরা পাচ্ছেন বিনামূল্যে অপারেশন গোয়ালন্দঘাট থানার বিশেষ অভিযানে ৭ ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেফতার ‘হাসনাত আবদুল্লাহর কাছে এখনো ৮০০ টাকা পাই’ শুকিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, পানি নিয়ে হতে পারে যুদ্ধ ‘শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী হচ্ছে’: সেনা প্রধান অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

শুকিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, পানি নিয়ে হতে পারে যুদ্ধ

বুধবার,১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ভূগর্ভস্থ পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু সংকট ও কয়েক দশকের অতিরিক্ত উত্তোলনের চাপে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে করে অদূর ভবিষ্যতে অঞ্চলটিতে পানি নিয়ে যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। গ্রামীণ জীবনের ভিত্তি যেনো ধীরে ধীরে মাটির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে।

দশকের পর দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানি এ অঞ্চলের চাষাবাদের জন্য আশীর্বাদে পরিণত হয়েছিল। একসময় খরাপ্রবণ এই এলাকা গভীর নলকূপের কল্যাণে উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। এসব নলকূপের মাধ্যমে কৃষকেরা সারা বছর ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষাবাদ করতেন।

কিন্তু এখন সেই ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলো (অ্যাকুইফার) জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের চাপে দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮২ শতাংশেরও বেশি এলাকা ইতোমধ্যে তীব্র পানি সংকটে ভুগছে।

কয়েক প্রজন্ম ধরে চাষাবাদ করে আসা স্থানীয় কৃষক আতাউর রহমান জানান, আগের তুলনায় এখন পাইপ অনেক গভীরে বসাতে হয়। তারপরও আগের মতো পানি পাওয়া যায় না।

বর্তমানে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দিন দিন এ অঞ্চলে সেচের খরচ বাড়ছে, পানির প্রাপ্যতা কমছে এবং পানি নিয়ে বিরোধও বাড়ছে। এমনকি অনেক গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে নলকূপ থেকে পর্যাপ্ত খাবার পানিও মিলছে না।

শব্দরানী নামে স্থানীয় এক নারী কৃষক বলেন, অনেক সময় মোটর চালিয়েও পানি বের হয় না। তখন মনে হয় মোটর নষ্ট হয়েছে। কিন্তু আসলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরই অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।

গত বছর সরকার রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার প্রায় পাঁচ হাজার গ্রামে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এতে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। এসব গ্রামকে আগামী ১০ বছরের জন্য ‘পানি-সংকটাপন্ন অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে সেখানে কাজে ব্যবহারের জন্য কেবল ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু সেচ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা যাবে না।

সরকারের এমন সিদ্ধান্তে অনেক কৃষকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। কারণ নিষেধাজ্ঞার আগেই অনেকে বীজ, সার ও জমি প্রস্তুতির জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা দুই বছরের জন্য স্থগিত করেছে। কৃষকরা বলছেন, এত বড় সংকট মোকাবিলায় এই সময়সীমা যথেষ্ট নয়।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের পানি সংকট ও ঝুঁকি হ্রাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দুহা বলেন, কৃষকদের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নেই। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে গ্রামীণ সমাজে গুরুতর মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানি সংকট নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি।

বরেন্দ্র অঞ্চল মূলত উঁচু সমতলভূমি নিয়ে গঠিত। ফলে এটি বরাবরই কৃষির জন্য চ্যালেঞ্জিং। অঞ্চলটিতে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত ও হওয়ায় শক্ত মাটি সহজে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। ১৯৮০-এর দশক থেকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৮ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। এর ফলে সেচের পরিমাণ বেড়েছে এবং কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

সরকারের এমন পদক্ষেপ কৃষি উৎপাদন বাড়ালেও বোরো ধানের মতো অধিক পানি-নির্ভর ফসলের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা আরও গভীর করেছে। কৃষকরা বলছেন, সেচ ছাড়া ফসল হয় না, কিন্তু অতিরিক্ত পানি উত্তোলন কৃষির ভবিষ্যৎকেই হুমকির মুখে ফেলছে।

আতাউর বলেন, এভাবে পানি তোলা আমাদেরও খারাপ লাগে। কিন্তু উপায় নেই। সেচ ছাড়া চাষ করতে পারি না, আর চাষ না করলে বেঁচে থাকাও অনিশ্চিত। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো আর কৃষিকাজ করে টিকে থাকতে পারবে না।

স্থানীয় কৃষাণী শব্দরাণীর পরিবার নিজেদের ও বর্গাচাষের জমিতে ধান, ভুট্টা, ডাল, সরিষা ও সবজি চাষ করে। পাশাপাশি হাঁস-মুরগি ও গরু পালন করে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করে।

তিনি বলেন, সেচ খরচ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষিকাজ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আগে এক ঘণ্টা সেচের জন্য ৯০ টাকা খরচ হতো। এখন ১২০ টাকা খরচ হয়। এছাড়া সারের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন কমে গেছে।

অঞ্চলের অনেক কৃষক এখন কম পানি লাগে এমন ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। কৃষকেরা প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে ঘণ্টা হিসেবে সেচ দিলেও ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমে যাওয়ায় আগের মতো পানি পাওয়া যায় না।

স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ আসিফ বলেন, এখন বেশি টাকা দিয়েও আগের চেয়ে কম পানি পাওয়া যায়। আশপাশের অনেক গ্রামের তরুণ ইতোমধ্যে কাজের সন্ধানে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে চলে গেছেন। নিজের সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমার ছেলে যখন ২০ বছর বয়সী হবে, তখন এই জমির চেহারা অনেক বদলে যাবে। কখনও কখনও মনে হয়, পানির জন্য মানুষের লড়াই এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠবে যে একসময় যুদ্ধ পর্যন্ত বেধে যেতে পারে।

এই ভয় ও হতাশাই এখন গবেষক ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাজের পেছনে বড় প্রেরণা হয়ে উঠেছে। ব্র্যাক এবং গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং বোরো ধানের বিস্তার আগামী দুই দশকের মধ্যে বারিন্দ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্র্যাক একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ২,৪০০-এর বেশি কৃষককে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও পানি-সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং’ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ধানের জমিতে সবসময় পানি থাকে না; কয়েকদিন শুকিয়ে রেখে পরে আবার পানি দেওয়া হয়। এতে ফলনের কোনো ক্ষতি হয় না।

ব্র্যাকের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ আলী বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে শুধু পানি সরবরাহ বাড়ালেই হবে না। পানি-সাশ্রয়ী সেচ, জলবায়ু-সহনশীল ফসল, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের ফলে ২৫ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমি অনাবাদি হয়ে যেতে পারে এবং খাদ্য উৎপাদন প্রায় ২৭ লাখ টন কমে যেতে পারে। এতে যেসব পরিবার ইতোমধ্যেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বিপর্যস্ত, তাদের ঋণের বোঝা বাড়বে, শহরমুখী অভিবাসন ত্বরান্বিত হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Tags:

সম্পর্কিত খবর :