সাম্প্রতিক
প্রধানমন্ত্রী প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার রাজনীতি বিশ্বাস করেন না: চিফ হুইপ জুন মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৯.১৬ শতাংশ আমেরিকাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়েছে ইরান, ভারতীয় পন্ডিতের বক্তব্য ভাইরাল লালপুরে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বিষপান, রাজশাহীতে স্থানান্তর কুষ্টিয়া মিরপুরে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‍্যালি অনুষ্ঠি শ্রীপুরে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস পালিত স্বপ্ন বুকে নিয়ে পথচলা তিন বন্ধুর একসঙ্গে বিদায়, শোকে স্তব্ধ জাফলং বর্ণাঢ্য আয়োজনে নেত্রকোণায় জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উৎযাপন নওগাঁয় কৃষি প্রণোদনা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ সালমান শাহর দেহাবশেষ উত্তোলনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ

স্বপ্ন বুকে নিয়ে পথচলা তিন বন্ধুর একসঙ্গে বিদায়, শোকে স্তব্ধ জাফলং

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী সাকিব আহমদ, রায়হান আহমেদ (রাহুল) ও জয় আহমদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে । একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, একই শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করা এবং একই স্বপ্ন বুকে নিয়ে পথচলা তিন বন্ধুর একসঙ্গে বিদায় গোটা গোয়াইনঘাটকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
রোববার (৫ জুলাই) দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে উপজেলার মধ্যে জাফলং ইউনিয়নের রাধানগর-বাউরভাগ চা বাগান সড়কে তাদের বহনকারী একটি পালসার মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে গুরুতর আহত হয় তিনজন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তিন শিক্ষার্থীরই মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন উপজেলার নয়াবস্তি গ্রামের মহরম মিয়ার ছেলে সাকিব আহমদ (১৬), ছৈলাখেল গ্রামের হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়ার ছেলে রায়হান আহমেদ (রাহুল) (১৬) এবং লাখেরপাড় গ্রামের রাজ্জাক মিয়ার ছেলে জয় আহমদ (১৬)।
নিহত সাকিব আহমদের জানাজা রোববার বাদ মাগরিব জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে পারিবারিক সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সোমবার সকাল ১১টায় ছৈলাখেল অষ্টম খণ্ড কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে রায়হান আহমেদের জানাজা শেষে তাকে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। একই দিন বাদ জোহর লাখেরপাড় গ্রামের হামিদ আলী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে জয় আহমদকে দাফন করা হয়।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তিন বন্ধুর মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। স্কুল, খেলাধুলা কিংবা অবসর-সবখানেই তারা ছিলেন একে অপরের সঙ্গী। কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছে, হাসি-আড্ডা দিয়েছে; আর এখন তারা পাশাপাশি কবরের নীরব বাসিন্দা।
সোমবার নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠোনজুড়ে স্বজনদের কান্না আর ঘরের ভেতরে সন্তানহারা মায়েদের আহাজারিতে যেন বাতাসও ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ ছেলের স্কুলব্যাগ বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, কেউ বারবার ছেলের নাম ধরে ডাকছেন -একবার ফিরে আয় বাবা, আরেকবার মাকে ডেকে যা।
এক মায়ের আর্তনাদ, সকালে হাসিমুখে পরীক্ষা দিতে গেল, সন্ধ্যায় আমার বুক খালি করে চলে এলো। আরেক মা ছেলের ছবি বুকে চেপে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
নিহত সাকিবের বাবা মহরম মিয়া বলেন, আমার ছেলে খুব শান্ত-স্বভাবের ছিল। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ আমার বুকটাই খালি করে দিলেন।
রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়া বলেন, ছেলেটা সবার সঙ্গে হাসিখুশি থাকত। সকালে বের হয়েছিল, আর লাশ হয়ে ফিরবে-এটা কোনো বাবা মেনে নিতে পারে না।
জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
তিন বন্ধু একসঙ্গে চলাফেরা করত, আল্লাহ তাদের একসঙ্গেই নিয়ে গেলেন। তাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন।
তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রতিনিধিরা এ ঘটনাকে অপূরণীয় ক্ষতি বলে উল্লেখ করেছেন। সহপাঠীদের মধ্যে নূর হোসেনসহ অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছে, এক বেঞ্চের তিন বন্ধু এভাবে চলে যাবে, আমরা কখনো ভাবিনি।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী এ ঘটনাকে অপূরণীয় ক্ষতি আখ্যা দিয়ে বলেন, এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো, লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা যাতে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই শ্রেণির তিন বন্ধুর এই করুণ বিদায় শুধু তিনটি পরিবারের নয়, পুরো গোয়াইনঘাটের বুকেই এক গভীর ক্ষতের জন্ম দিয়েছে। তাদের অকাল মৃত্যু আবারও স্মরণ করিয়ে দিল-একটি বেপরোয়া গতি মুহূর্তেই নিভিয়ে দিতে পারে বহু স্বপ্ন, বহু সম্ভাবনা এবং তিনটি পরিবারের সমস্ত আলো।

Tags:

সম্পর্কিত খবর :