কাদামাটির গায়ে রঙের হালকা পরশ, আর তাতেই যেন দেবীর চোখে ভেসে উঠছে প্রাণ। কোথাও কারিগরের তুলির নিপুণ আঁচড়, আবার কোথাও আলোকসজ্জায় রঙিন হয়ে উঠছে চারপাশ। শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে দক্ষিণ উপকূলীয় উপজেলা খুলনার কয়রা এখন উৎসবের আনন্দে মুখর।
উপজেলাজুড়ে এবার ৫৭টি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের এই বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আয়োজনের প্রস্তুতি এখন একেবারেই শেষ প্রান্তে।
কয়রা সদর ও আশপাশের ৬ নম্বর কয়রা সার্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দির, শ্রী শ্রী গোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দির, ৬ নম্বর কয়রা পূর্বপাড়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, মঠবাড়ী খড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, দশহালিয়া দুর্গা মন্দির এবং আমাদী বাজার দুর্গা মন্দিরসহ বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখা যায় এক ব্যস্ততম চিত্র। শিল্পীদের হাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর রূপ পূর্ণতা পাচ্ছে। মাটির কাজ শেষ করে কোথাও চলছে পোশাক ও অলংকার পরানোর ব্যস্ততা, আবার কোথাও প্যান্ডেল তৈরি ও চোখধাঁধানো আলোকসজ্জার কাজ চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
শৈশব থেকে প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত কারিগর নিশিকান্ত গাইন বলেন, “মাটির প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পর রং ও তুলির মাধ্যমে দেবীকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়। বিশেষ করে দেবীর চোখের অভিব্যক্তি ও অলংকরণের সূক্ষ্ম কাজে গভীর মনোযোগ ও সময় লাগে। সময় যত কমছে, কাজের চাপও তত বাড়ছে।”
উৎসবের এই আবহে কেবল কারিগররাই নন, ব্যস্ত সময় পার করছেন মণ্ডপ পরিচালনা কমিটির সদস্যরাও। দর্শনার্থীদের আকর্ষণ ও মণ্ডপের সৌন্দর্য বাড়াতে দিন-রাত চলছে সাজসজ্জা ও ধোয়ামোছার কাজ। প্রতিমার এই রূপ বদল ও প্রস্তুতি দেখতে মাঝরাতেও মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় জমাচ্ছেন স্থানীয় দর্শনার্থীরা।
কয়রা উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক দিলিপ কুমার বৈরাগী জানান, “উপজেলার ৫৭টি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় সমাপ্ত। বর্তমানে মণ্ডপগুলোর আলোকসজ্জা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ চলছে। সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় একটি আনন্দঘন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব সম্পন্ন হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
৬ নম্বর কয়রা সার্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক অশোক মন্ডল নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন, “সারা বছর আমরা এই দিনগুলোর জন্যই অপেক্ষায় থাকি। আয়োজনের এই তোড়জোড় দেখে মন আনন্দে ভরে ওঠে। সবার অংশগ্রহণ ও মেলবন্ধনে চমৎকার একটি উৎসব উদযাপিত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
উৎসবকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ।
কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাঃ রাশেদুল আলম জানান, “দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশের পাশাপাশি পর্যাপ্ত আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন থাকবে। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।”
উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আব্দুল্লাহ-আল বাকী বলেন, “সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এই ধর্মীয় উৎসব যেন ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হতে পারে, সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কড়া নজরদারি বজায় থাকবে।”




