আব্দুল আলী নামে এক বহুরুপি প্রতারক হিসাবে পরিচিত । কখনো কিক বক্সার’ মোহাম্মদ আলী জ্যাকো’ নামেই যুক্তরাজ্য দেশে-বিদেশে নন্দিত-নিন্দিত নাম ।
তার গ্রামের বাড়ি হচ্ছে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার ইউনিয়নের পাইগাঁও গ্রামের চমক আলীর পুত্র। সাম্প্রতি লন্ডন থেকে দেশে এসেই আবারও শুরু করেছেন নানা বিতর্কিত কর্মকান্ড। মানুষকে দিচ্ছেন নানা ভূঁয়া প্রতিশ্রুতি। করছেন নানা ধরণের ভূং-ভাং।
স্থানীয় একটি সুত্র জানিয়েছে, গত কয়েক বছর আগে একবার দেশে এসে সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যেকটি হাইস্কুল ও প্রাইমারী স্কুলে স্টেডিয়াম নির্মাণের নাম করে সরকারি খাস জমির পাশাপাশি নিরীহ-দূর্বল আর দরিদ্র লোকজনের কৃষিজমি হয় স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়ে জবরদখল করার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে এলাকায় শুরু হচ্ছে ব্যাপক তোড়পাড়। প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে স্থানীয় জনসাধারণ।
ফলে বিগত সরকারের আমলে আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফ,সাবেক আইন মন্ত্রী আনিসুর রহমান বিচারপতি সামুছর রহমান মানিক ও সাবেক এমপি মুহিবুর রহমান মানিকসহ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে সু-সম্পর্ক থাকা স্বত্তেও জনরোষের কারণে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তার অপকর্মের সঙ্গীদের নিয়ে দেশ ছেড়ে লন্ডনে পালিয়ে যান আলী জ্যাকো।
তখন সুবিধা করতে না পারলেও এবার মুখোশ পাল্টে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে সম্প্রতি আবারও দেশে ফিরেছেন তিনি।এসেই ঘোষণা দিয়েছেন এবার তিনি নিজের অর্থে দেশে ৬ হাজার স্টেডিয়াম নির্মাণ করে দেবে। এ নিয়ে শুরু করেছেন নানা তোড়-জোড়।বতমান জেলা প্রশাসক,অতিরিক্ত প্রশাসককে হাত করার অসৎ উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যেই জেলা পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে,ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেন। আওয়ামীলীগের দোসরদের ক্ষমতার টাপট দেখিয়ে নিজেকে জাহির করতে শুরু করেছে। এসব ঘটনার খবর আবার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ স্থান পেয়েছে।
অথচ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একবারও তাকে জিজ্ঞেস করছেন না, এতোগুলো স্টেডিয়াম নির্মাণ করার অর্থ আসবে কোথা থেকে? তার নিজেরাই বা আয়ের উৎস কী? আর এসব অপতৎপরতা দেখে এলাকাবাসীর মধ্যে শুরু হচ্ছে না গুঞ্জন। না জানি কী নতুন মিশন নিয়ে আলী জ্যাকো এবার দেশে এসেছেন? কার বা কাদের মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে তিনি শুরু করেছেন নতুন ষড়যন্ত্র। এবারও আলী জ্যাকোর সঙ্গে রয়েছেন দক্ষিণ ছাতক এলাকায় নানা অপকর্মের হোতা, চিহ্নিত সন্ত্রাসী পাইগাঁও নিবাসী মৃত ঠাকুর মিয়ার পুত্র যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবির আহমদ ও সিংচাপইড় ইউনিয়নের গহরপুর নিবাসী মৃত রইছ আলীর পুত্র যুক্তরাজ্য প্রবাসী তাজ উদ্দিনসহ হত্যা, মাদকসেবী-চাঁদাবাজ প্রকৃতির একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। এদেরকে সাথে নিয়ে আলী জ্যাকো প্রতিদিন সরকারি খাস জমি আর টার্গেট করে ভূমি খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
এবার দেশে এসে আলী জ্যাকো ঘটিয়েছেন আরেক কান্ড। জাউয়াবাজারে একটি দোকান কোটার মালিকানা নিয়ে স্থানীয় ভাতগাঁও ইউনিয়নের ছাতারপই নিবাসী যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল দয়াছ ও দূর্গাপাশা ইউনিয়নের ছয়হারা নিবাসী রওশন খান সাগরের সঙ্গে আলী জ্যাকোর মাতা গুলনাহার বেগমের সঙ্গে মামলা চলছে।
১২ বছর পর গত ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত দোকানকোটার মালিকানা আব্দুল দয়াছ গংদের পক্ষে বলে রায় দেন। শুধু তাই নয়, ১২ বছর সিলগালা থাকা দোকান কোটাটি আব্দুল দয়াছ কাছে সমজিয়ে দেয়ার জন্য আদালত ধেকে সহকারি ভুমি কমিশনার আবুল নাসিরকে নির্দেশ দেন।
সে অনুযায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবুল নাসির জাউয়াবাজার ব্যবসায়ি ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে দোকানকোটা সমজিয়ে দেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে আলী জ্যাকো বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক ফুটবলার কায়সার হামিদ ও সিংচাপইড় ইউনিয়নের গহরপুর নিবাসী জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার ১নং আসামী একই গ্রামের বাসিন্দা যুক্তরাজ্য প্রবাসী চিহ্নিত প্রতারক ও সন্ত্রাসী তাজ উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে দোকান কোটা জবরদখলের চেষ্টা করে । সরাসরি আদালতকে অবমাননার এই খবর পেয়ে জাউয়াবাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই আব্দুল কবির পুলিশ ফোর্স নিয়ে তাদের নিবৃত্ত করেন এবং জ্যাকোর বিরুদ্ধে থানায় একটি জিডি এন্ট্রি করেন (জিডি নং-৬১৪/২৫)।
জানা গেছে, দেশে-বিদেশে নানা অপকর্মের সাথে জড়িত আলী জ্যাকো। তার সকল অপকর্মের নিত্যসঙ্গী ছোট ভাই নুরুল আলী ওরফে ‘পুঙ্গা নুরুল’। ড্রাগ ডিলার হিসেবে লন্ডন পুলিশের খাতায় দু’জনের নাম রয়েছে রেড লিস্টে। রয়েছে পতিতা ও নারী পাচারের ব্যবসা অভিযোগ। আলী জ্যাকোর পাকিস্তানী স্ত্রী উজমা নাজির’র মালিকানাধীন ‘ক্লাব ওপস’ (ট্রেডার্স সিটি লিমিটেড) নামে একটি এ্যাডাল্ট ক্লাব ছিল। এ ক্লাবে ব্রিটেনে বসবাসরত সকল প্রকারের মানুষ অবাধে মেলামেশা করতে পারতো। কিন্তু অতিরিক্ত দেনার কারণে ২০১৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর এটি ব্যাংকরাপ্ট হয়ে যায়। ‘ক্লাব ওপস’ বন্ধ হয়ে গেলে বিকৃত রুচির আলী জ্যাকো ব্রিটিশ-বাংলাদেশী চেম্বার অব কমার্স-এর সেক্রেটারি মুহিত চৌধুরীকে পার্টনার করে ‘চার্লিস এ্যানজেল’ নামে নতুন করে আবার নারী-পুরুষদের অবাধ মেলামেশার ক্লাব চালু করে। তার নামে নাইট ক্লাব হলেও দিবারাত্রি এখানে চলে নানা রকমের কুকীর্তি। বিগত পতিত সরকারের আমলে ব্রিটেনে বেড়াতে যাওয়া সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা, মন্ত্রী, এমপি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অবসর বিনোদনের সেরা পছন্দের স্থান ছিল আলী জ্যাকোর চার্লিস এ্যানজেল। এ সুবাদে বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি এম এ কুদ্দুছ খানের সাথে পরিচয় হয়। আলী জ্যাকো সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়েননি। তিনি বাংলাদেশের বক্সারদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং ব্রিটেনে ফাইটিং ইভেন্ট আয়োজন করবেন বলে কুদ্দুছ খানকে প্রস্তাব দিলে কুদ্দুছ খান ভালো সুযোগ মনে করে ঢাকাস্থ অফিসে আলী জ্যাকোর সাথে কয়েক দফা বৈঠক করে। তার আগ্রহের ভিত্তিতে বক্সিং ফেডারেশন বেশ ঘটা করেই ‘ট্যালেন্ট হান্ট’র আয়োজন করে। যেখানে দেশের সার্ভিসেস দল সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, বিকেএসপি, রেলওয়ে ও বিভিন্ন ক্লাবের বক্সাররা অংশ নেন। এই সুযোগে আলী জ্যাকো আদম পাচারের লক্ষ্যে প্রতারণার ফাঁদ সৃষ্টি করে । বেশ কয়েকজনকে লন্ডন নেয়ার কথা বলে ১৫/২০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেন। বক্সার বাছাইকালে যখন বক্সিং ফেডারেশনের বাছাইকৃত বক্সারদের বাদ দিয়ে বহিরাগতদের ব্যাপারে আলী জ্যাকো আগ্রহী হন। তখন তার থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। আদম পাচারের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বক্সিং ফেডারেশন আলী জ্যাকোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত আর বাংলাদেশ থেকে বক্সারদের যাওয়া হয়নি। এ নিয়ে পরবর্তীতে ভূক্তভোগীরা
২০১৪ সালে ২৮ ডিসেম্বর আলী জ্যাকোর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন ঢাকায়। আলী জ্যাকোর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। অবৈধ অর্থ হাতানোর অসৎ অভিপ্রায়ে সিএ (পিতা চমক আলী) ফাউন্ডেশন নামে একটি ওয়েবসাইট খুলেন আলী জ্যাকো। সিএ ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট অনুসন্ধানে দেখা যায়, সুনামগঞ্জের ছাতকে ১শত ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮শ’ কার পার্কিং সুবিধাসহ অত্যাধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের উল্লেখ রয়েছে। ওয়েবসাইটে স্টেডিয়াম ছাড়াও স্কুল ও হাসপাতালের স্কেচও এঁকে দেখানো হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেবামূলক সাইট হলেও এখানে নিজের বিরুদ্ধে দায়েরি মামলা-মোকদ্দমার
শত শত মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। এসব অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ডান্সিং ক্লাবের মহিলা স্টাফরা ২০১১ সালের ২৫ আগষ্ট ৫হাজার ২শত ৫০ পাউন্ড এবং জনৈক ডোনার ২৫০ পাউন্ড অনুদান দেন। কিন্তু এই অর্থ এখন কোথায়? উপজেলা ছাতকে তার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা প্রতারনার অভিযোগএসব নিয়ে তার সঙ্গে মুখামুখি হলে প্রশ্ন করলে আলী জ্যাকোর কাছে তার কোন জবাব নেই। । পাইগাঁও এলাকায় আধুনিক হাসপাতাল ও স্টেডিয়াম নির্মাণ করার কথা বলে স্থানীয় কৃষককুলকে ধোঁকা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে অনেক কৃষিজমি নামমাত্র মুল্যে ক্রয় করেন। একপর্যায়ে আলী জ্যাকো একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে স্থানীয় নিরীহ মানুষের ওপর হামলা মামলা দায়ের করেন।
হামলা-মামলা করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে থাকেন তিনি। এলাকার বিভিন্ন মানুষের বিরুদ্ধে ডজনখানেক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ নিয়ে এলাকার জনৈক সমছু মিয়াসহ আরেক ব্যক্তির সাথে তার মামলা চলছে। এছাড়া এক রিকশা চালককে অন্যায় ভাবে হত্যার অপরাধে মামলার আসামীও তিনি। হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা আদালতে এখনও বিচারাধীন আছে। জানা গেছে, আলী জ্যাকো ‘আইএসআইএল’ নামক একটি জঙ্গীবাদী গ্রুপের হয়ে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।। আর এ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এম-১৫ বিষয়টির তদন্ত চলছে। যুক্তরাজ্যের বাঙালি কমিউনিটিতে এক রকমের ‘অচ্যুত, নিন্দিত ও ঘৃণিত’ আলী জ্যাকো ও নুরুলের চলাফেরা আইনের চোখে যত অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, পতিতা ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, ‘আলী জ্যাকোর পাকিস্তানী স্ত্রী উজমা নাজিরের পিতা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে শশুড়ের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে দেশে নানা রকমের কুকর্ম করতেন জ্যাকো। বিগত সময়ে একজনের সঙ্গে তার করা ইয়াহু চ্যাট ফাঁস হয়ে পড়ে। তাদের এসব অপকর্ম থেকেই বুঝা যায় পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের পরিবারের একটি গুড কানেকশন রয়েছে।)
এব্যাপারে আলী জ্যাকোকে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফনে একাধিক কল করলে মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ব্যস্ত আছে বলে মোবাইল ফন কেটে দেন তিনি।