ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশব্যাপী মানুষকে মশারি টানিয়ে ঘুমানো, ফুলহাতা শার্ট এবং লম্বা পায়জামা বা লুঙ্গি পরার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে মোট শয্যার ১০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালীবিধির ৭১ বিধিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলামের দেওয়া জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকার ডেঙ্গু পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করেছে। নিয়মিত মশা নিধনে স্প্রে করা হচ্ছে এবং লার্ভা ধ্বংসে ট্যাবলেট ছিটানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী মানুষকে মশারি টানিয়ে ঘুমানো, ফুলহাতা শার্ট পরা এবং পায়জামা বা লুঙ্গি লম্বা করে পরার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা সরকার গ্রহণ করেছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রিএজেন্টের স্মরণকালের সর্বোচ্চ মজুদ বর্তমানে সরকারের হাতে রয়েছে, যা অতীতে কোনো সরকারের ছিল না। পরীক্ষার কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় গুদামেও পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
দেশব্যাপী ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সর্বাত্মক প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মোট শয্যার ১০ শতাংশ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি কমিয়ে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত কিট ও স্যালাইন মজুদ রাখা হয়েছে।
সংসদে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৯৭৮ জন এবং মারা গেছেন ২৮ জন। অন্যদিকে, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ২১০ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৮ জনের।
মন্ত্রী বলেন, পরিসংখ্যান অনুযায়ী গতবারের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। তবে সরকার এতে আত্মতুষ্টিতে ভুগছে না, কারণ এখনো মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি জানান, সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু এনএসওয়ান পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। পাশাপাশি আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষার ফি ৩০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে ১ লাখ ৬ হাজার ৬০০টি পরীক্ষার কিট মজুদ রয়েছে এবং আগামী এক মাসের মধ্যে আরও ৫ লাখ কিট যুক্ত হবে। এছাড়া বিশেষ রিজার্ভ হিসেবে ১ লাখ অতিরিক্ত স্যালাইন ব্যাগ সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালের প্রস্তুতি সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। সেখানে তাদের মোট শয্যার ১০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য খালি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের নির্ধারিত হারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার বিষয়েও তারা সম্মতি দিয়েছেন।
মন্ত্রী আরও জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে তা মোকাবিলায় মোবাইল হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর প্রস্তুতিও রয়েছে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২টি জেলায় ১০ শয্যার আইসিইউ চালু হয়েছে এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরও পাঁচটি জেলায় এ সুবিধা চালু করা হবে।
মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার চলমান কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ’মশা খুবই ক্ষুদ্র একটি পতঙ্গ। আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। অনেক সময় বাড়ির ভেতরে মশক নিধনকর্মীদের প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়। তাই সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে।’
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকার এ বিষয়ে সজাগ রয়েছে। নিয়মিত স্প্রে ও লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশব্যাপী মানুষকে মশারি টানিয়ে ঘুমানো, ফুলহাতা শার্ট পরা এবং লম্বা পায়জামা বা লুঙ্গি পরার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।












