ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এক আলিম পাস যুবকের বন্দিজীবন

চারদিকে ইট-সিমেন্টের খাঁচা, আর ওপরে কেবল এক টুকরো টিনের ছাউনি। যে ঘরে মানুষ থাকার কথা শান্তিতে, সেখানে স্বাভাবিক চলাচলের কোনো দরজাই নেই। কেবল জানালার মতো একটি ছোট্ট অংশে বসানো রয়েছে ভারী লোহার গ্রিল। আর সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়েই চলে খাবার দেওয়া-নেওয়া।
​খাঁচায় বন্দি কোনো বন্য প্রাণী নয়, এটি বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের সাড়ে পাঁচ আনী গ্রামের একটি ঘরের দৃশ্য—যেখানে দীর্ঘ আট বছর ধরে এভাবেই কেটে গেছে একটি মানুষের জীবন। আর পায়ে শিকল পরার সময়কাল ধরলে এই বন্দিজীবনের মেয়াদ প্রায় ১২ বছর।
​খাঁচাবন্দী এই মানুষটির নাম সামিম হাওলাদার (৩৮)। একসময়ে যিনি ছিলেন মসজিদের মিনার কিংবা মাদ্রাসার ক্লাসরুমের এক মেধাবী মুখ। দাখিল ও আলিম পাস করা সামিম নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, সমাজে সবার সাথে মিলেমিশে চলাফেরা করতেন। তারও ছিল একটি সুন্দর সংসার, স্ত্রী আর এক কন্যাসন্তান। কিন্তু নিয়তির এক নিষ্ঠুর নির্মমতায় পরিহাসে আচমকাই ওলোটপালোট হয়ে যায় তার জীবন। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার পর একে একে হারিয়েছেন স্ত্রী, সন্তান আর স্বাভাবিক জীবনের সব আলো।
​​স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে হঠাৎ করেই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন সামিম। প্রথম দিকে তিনি গ্রামের এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতেন, মাঝেমধ্যে সাধারণ মানুষকে মারধরও করতেন। সময় গড়ানোর সাথে সাথে তার আচরণ আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। পরিবার-পরিজন, এমনকি বৃদ্ধ বাবা-মা ও ভাইদের ওপরও চড়াও হন তিনি। নিজের শিশুকন্যাটিকেও দা নিয়ে তাড়া করার মতো ঘটনা ঘটে।
​চারপাশের মানুষের নিরাপত্তা আর পরিবারের অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করে প্রথমে তার পায়ে পরানো হয় লোহার শিকল। পরবর্তীতে বাড়ির পাশেই ইট ও টিন দিয়ে একটি ছোট ঘর তৈরি করে তাকে স্থায়ীভাবে আটকে রাখা হয়। সেই থেকেই চার দেওয়ালের এই অন্ধকার ঘরটিই হয়ে ওঠে সামিমের একমাত্র ঠিকানা।
​​সরেজমিনে দেখা যায়, সামিমের সেই বন্দিশালার একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম ওই লোহার গ্রিলটি। কেউ বাইরে থেকে ডাক দিলে তিনি গ্রিলের কাছে এগিয়ে আসেন, শান্তভাবে কথা বলেন। এমনকি কেউ অনুরোধ করলে সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়েই সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করে শোনান। কিন্তু এই মেধার মানুষটিই গত এক যুগ ধরে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে পারেননি, দেখেননি প্রকৃতির রূপ, মিশতে পারেননি কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে।
​সামিমের প্রতিবেশী হৃদয় ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “সামিম ভাই একসময় এই এলাকার অন্যতম ভালো মানুষ ছিলেন। হঠাৎ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার পর থেকেই তাকে এভাবে ঘরবন্দি রাখা হয়েছে। কী কারণে তার এমন হলো, তা আমাদের আজও অজানা।”
​সামিমের চাচাতো ভাই বাবুল হোসেন জানান, পরিবারের সবার ওপর তার আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে একপর্যায়ে এলাকার লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করেই তাকে আলাদা ঘরে বন্দি রাখার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
​​ছেলের এই করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারেননি বৃদ্ধ বাবা কালাম হাওলাদার। সন্তানের চিকিৎসার জন্য নিজের শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেছেন, মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, করেছেন পাহাড়সম ধারদেনা। কিন্তু কোনো চিকিৎসাতেই সুস্থ হয়ে ওঠেননি সামিম। সময়ের নিষ্ঠুর আঘাতে আজ সেই পিতা নিজেও পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী।
​বৃদ্ধ পিতা কালাম হাওলাদার বলেন, “ছেলের চিকিৎসার জন্য যা ছিল সব শেষ করেছি। অনেক জায়গায় ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এখন আমি নিজেও প্যারালাইজড হয়ে পড়ে আছি। আমি মরে গেলে আমার এই পাগলা ছেলের কী হবে—এই চিন্তায় আমার বুক ফেটে যায়।
​​১২ বছর ধরে একজন যুবকের এভাবে পশুর মতো খাঁচাবন্দী জীবন কাটানোর হৃদয়বিদারক এই সংবাদটি পৌঁছায় উপজেলা প্রশাসনের পর্যন্ত।
​এ বিষয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, “আলিম পাস করা একজন মানুষ এভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘরবন্দি অবস্থায় রয়েছেন— বিষয়টি সত্যিই অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর আমি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে। প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী নিয়ে আমরা তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।
​সামিমের নিথর লোহার গ্রিল ভেদ করে যে কোরআনের সুমধুর আওয়াজ ভেসে আসে, তা হয়তো একদিন সত্যি সত্যিই মুক্তি নিয়ে আসবে—এই আশাটুকুই এখন কেবল বেঁচে আছে তার বৃদ্ধ ও অসহায় পিতার ভাঙা হৃদয়ে।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

বেনাপোল পেঁচের বাওড় এলাকার চিত্র: উচ্ছেদ আতঙ্কে ভূমিহীন শীউলী খাতুনের মানবেতর জীবন ও স্থানীয় নানা অনিয়মের অভিযোগ

 একসময়ের ভয়ের জনপদ বেনাপোলের পেঁচের বাওড় এলাকা এখন সময়ের পরিক্রমায়

Scroll to Top