বর্ষা এলেই দক্ষিণাঞ্চলের প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে। আর সেই সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজার। শ্রাবণ-ভাদ্রের শুরুতেই গাছে গাছে পাকা পেয়ারা, খালজুড়ে নৌকার সারি এবং দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। চলতি মৌসুমে পেয়ারার বাণিজ্যিক কার্যক্রমও পুরোদমে শুরু হয়েছে।
প্রায় দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী এই অঞ্চলের কুড়িয়ানা, আটঘর, ভিমরুলি, জলাবাড়ি, ধলহারসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার একর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি ফল নয়, বরং হাজারো কৃষক, মাঝি, ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
ভোর থেকেই কৃষকরা ছোট ছোট নৌকায় করে বাগান থেকে সদ্য তোলা পেয়ারা নিয়ে ভাসমান বাজারে আসেন। এখানেই পাইকাররা নৌকাতেই দরদাম করে বিপুল পরিমাণ পেয়ারা কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠান।
পেয়ারার পাশাপাশি আমড়া, লেবু, কলা, নানা ধরনের শাক-সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যও বিক্রি হচ্ছে এই অনন্য বাজারে।
শুধু কৃষি বাণিজ্য নয়, পর্যটনের ক্ষেত্রেও পিরোজপুরের এই পেয়ারার জনপদের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ভিড় করছেন। খালের দুই পাশে সবুজ পেয়ারা বাগান, নৌকাভর্তি ফল এবং গ্রামীণ প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। এতে নৌকা চালক, স্থানীয় দোকানদার, গাইড ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে কৃষকদের প্রত্যাশার পাশাপাশি রয়েছে কিছু উদ্বেগও। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং মৌসুমের শেষ দিকে দামের বড় ধরনের পতন প্রতিবছরই তাদের ক্ষতির মুখে ফেলে। কৃষকদের দাবি, এলাকায় আধুনিক সংরক্ষণাগার, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং সহজ বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে এই ঐতিহ্যবাহী পেয়ারা শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে।
পিরোজপুরের নেছারাবাদের পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজার বাংলাদেশের কৃষি ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির অসাধারণ সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল প্রতি বর্ষাতেই দেশ-বিদেশের পর্যটক ও ক্রেতাদের জন্য হয়ে ওঠে এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।।












